বিশ্ব বাণিজ্য যখন একের পর এক ধাক্কা খাচ্ছে এবং অনেক দেশের কাছেই ২০২৪–২৫ অর্থবর্ষ যেন এক “অশুভ বছর”, ঠিক সেই সময়েই ভারতের জন্য ২০২৫ হয়ে উঠেছে বাণিজ্যগত গতির বছর। জুলাই মাসে ভারত ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছে কম্প্রিহেনসিভ ইকনমিক অ্যান্ড ট্রেড এগ্রিমেন্ট (CETA), ডিসেম্বর মাসে ওমানের সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে একটি কম্প্রিহেনসিভ ইকনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট (CEPA)। আর এখন, মাত্র নয় মাসের রেকর্ড সময়ে, আইনি পর্যালোচনা ও আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা ভারত–নিউজিল্যান্ড মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) চূড়ান্ত হয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চিলি এবং ইউরেশিয়ান ইকনমিক ইউনিয়নের সঙ্গে প্রাথমিক ও ধাপে-ধাপে বাণিজ্য আলোচনার পাশাপাশি কানাডার সঙ্গে পুনরুজ্জীবিত আর্লি প্রগ্রেস ট্রেড এগ্রিমেন্ট—সব মিলিয়ে ভারতের নতুন বাণিজ্য কৌশলের একটি স্পষ্ট ছবি ধরা পড়ছে। ভারত এখন এমন দ্বিপাক্ষিক চুক্তির দিকে এগোচ্ছে, যা নিয়মভিত্তিক, উচ্চমানের এবং দেশের শক্তি ও অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ—প্রতিযোগিতামূলক সংঘাত নয়, বরং পরিপূরক সম্পর্কই যার মূল ভিত্তি।
নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে বাস্তববাদী অংশীদারিত্ব
ভারত–নিউজিল্যান্ড FTA প্রথম নজরে দেখলে একেবারেই বাস্তবধর্মী একটি চুক্তি। বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ মাত্র ২.৪ বিলিয়ন ডলার—অর্থাৎ সম্ভাবনার দরজা এখনও অনেকটাই খোলা। তবে এই চুক্তির গুরুত্ব শুধু সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। এটি স্পষ্ট করে দেয়, ভারত ভবিষ্যতের সমৃদ্ধি গড়তে চাইছে মানুষকে কেন্দ্রে রেখে, শুধু পণ্য নয়। দীর্ঘদিন ধরে ভারতের বাণিজ্য নীতিকে একটি ভ্রান্ত দ্বিধার মধ্যে বন্দি করে রাখা হয়েছিল—একদিকে বাজার খুলে দিলে আমদানি বাড়ার আশঙ্কা, অন্যদিকে সাবধানতা অবলম্বন করলে বিশ্বায়নের সুযোগ হারানোর ভয়। RCEP-এ যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্তের পরই এই দ্বিধার অবসান ঘটে। ভারত তখন থেকেই তার বাণিজ্য কৌশলকে “পরিপূরকতা”-র ভিত্তিতে নতুন করে সাজাতে শুরু করে।
এই কৌশলগত পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে গত কয়েক বছরে হওয়া অভ্যন্তরীণ সংস্কার। ২০২৫ সালে চালু হওয়া GST 2.0, বিদেশি বিনিয়োগ নীতির সরলীকরণ, উৎপাদন-সংযুক্ত প্রণোদনা (PLI) প্রকল্পের সম্প্রসারণ, ডিজিটাল প্রশাসনের উন্নতি এবং চারটি শ্রম আইন বাস্তবায়ন—এই সব মিলিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বেড়েছে। এই সংস্কার-নির্ভর শক্ত অবস্থান থেকেই ভারত এখন বাণিজ্য আলোচনায় বসছে। নিউজিল্যান্ড এই কৌশলের সঙ্গে ভালোভাবেই মানানসই। এটি একটি উচ্চ-আয়ের, নিয়মভিত্তিক অর্থনীতি, যা ভারতের বৃহৎ শিল্প উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতায় নেই। বরং তারা ভারতীয় পরিষেবা, দক্ষ জনশক্তি এবং ভোক্তা পণ্যের জন্য উন্মুক্ত বাজার দিতে প্রস্তুত।
শুল্ক ছাড়, সুরক্ষা এবং মানুষের অগ্রাধিকার
এই চুক্তির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো—নিউজিল্যান্ড ভারতের সমস্ত রপ্তানির ওপর সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দিয়েছে। আংশিক নয়, প্রায় নয়—পুরোপুরি। এর ফলে বস্ত্র, চামড়া, জুতো, রত্ন ও গয়না, সামুদ্রিক পণ্য, খেলনা ও হস্তশিল্পের মতো শ্রমনির্ভর খাতগুলির জন্য এক বিরল সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি রপ্তানিকারকরা এখন নিশ্চিন্তে দরপত্র দিতে, চুক্তি করতে এবং দ্রুত পণ্য পাঠাতে পারবেন।
অন্যদিকে, ভারত প্রায় ৭০ শতাংশ শুল্ক লাইনে ছাড় দিয়েছে, যা মোট বাণিজ্যের মূল্যের ৯৫ শতাংশের সমান। তবে এই ছাড় দেওয়া হয়েছে পরিকল্পিতভাবে—কিছু পণ্যে তাৎক্ষণিক ছাড়, কিছু ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে হ্রাস, আবার কিছু সংবেদনশীল কৃষিপণ্যে সীমিত কোটা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—দুগ্ধখাত সম্পূর্ণভাবে সুরক্ষিত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি বেশ কিছু কৃষিপণ্য ও কৌশলগত শিল্পেও শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়নি। এটি স্পষ্ট বার্তা দেয়—ভারত মুক্ত ও আধুনিক বাণিজ্য চুক্তি করতে প্রস্তুত, কিন্তু তা কৃষক, MSME এবং খাদ্য নিরাপত্তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে নয়। এটি সুরক্ষাবাদ নয়, বরং গণতান্ত্রিক অগ্রাধিকার।
পরিষেবা ও মানবসম্পদের ওপর জোর
এই চুক্তির আসল মেরুদণ্ড পণ্য নয়, পরিষেবা ও মানবসম্পদ। নিউজিল্যান্ড তাদের ইতিহাসে সবচেয়ে উদার পরিষেবা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে—আইটি, শিক্ষা, আর্থিক পরিষেবা, পর্যটন ও নির্মাণ খাতে ভারতীয় সংস্থাগুলির জন্য বিস্তৃত সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে রয়েছে MFN ধারা—ভবিষ্যতে নিউজিল্যান্ড অন্য কোনও দেশকে ভালো শর্ত দিলে, ভারতও তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাবে। সবচেয়ে নতুন সংযোজন হলো টেম্পোরারি এমপ্লয়মেন্ট এন্ট্রি ভিসা। এর মাধ্যমে এক সময়ে ৫,০০০ ভারতীয় পেশাজীবী নিউজিল্যান্ডে কাজ করতে পারবেন। শিক্ষার্থী, গবেষক এবং বিশেষ দক্ষতার পেশার জন্যও বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে। প্রবাসী ভারতীয় সমাজকে কেন্দ্র করে এক ধরনের “জীবন্ত সেতু” গড়ে উঠছে। সমালোচকরা একে অতিরিক্ত ছাড় বললেও বাস্তবতা হলো—আজকের বিশ্ব বাণিজ্য মূলত প্রতিভার প্রতিযোগিতা। এই চুক্তি নিউজিল্যান্ডের দক্ষতার ঘাটতি পূরণ করবে এবং ভারতের জন্য তৈরি করবে দক্ষতা সঞ্চালনের পথ।
ভবিষ্যৎ ও বাস্তবায়ন
চুক্তিটি কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ নয়। দ্রুত কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স, মান নিয়ন্ত্রণে সহযোগিতা, কৃষি প্রযুক্তি বিনিময়, GI সুরক্ষা, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের অনুমোদন সহজীকরণ—সবই এতে অন্তর্ভুক্ত। পাশাপাশি আগামী ১৫ বছরে ভারতে ২০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে নিউজিল্যান্ড। নিশ্চয়ই বাস্তবায়নই হবে আসল পরীক্ষা। কিন্তু কাঠামো, ভারসাম্য ও দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে এই চুক্তি ভারতের ভবিষ্যৎ বাণিজ্য নীতির একটি শক্তিশালী নকশা। এটি এমন এক বাণিজ্য মডেল, যেখানে শুল্কের চেয়ে মানুষ, উৎপাদনশীলতা ও অংশীদারিত্ব বেশি গুরুত্বপূর্ণ।